Friday, 16 October 2026

সাড়া ফেলেছে ‘কাঁঠালের বিস্কুট’

সাড়া ফেলেছে ‘কাঁঠালের বিস্কুট’

কাঁঠালের রাজধানী গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টন কাঁঠাল গাছেই পঁচে গলে নষ্ট হয়ে যেত। ভরা মৌসুমে গাছ পাকা কাঁঠালে সয়লাব হয়ে থাকে বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলো।এসময় কাঁঠালের দামও কম থাকে। পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতীয় এ ফলটি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় এ কাঁঠালের পচনরোধ করা সম্ভব হয় না।

তবে সেই চেনা গল্পটা এবার বদলে দিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া।
অপচয়রোধ আর কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের চিন্তা থেকে ‘কাঁঠালের বিস্কুট’ উৎপাদন ও বাজারজাত করে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। আর এই খাদ্যপণ্য উৎপাদনে তার কারখানায় কাজ করছেন অভিজ্ঞ কর্মীদল।

এদিকে ‘কাঁঠাল বিস্কুট’ উৎপাদনের খবরে স্থানীয় কাঁঠাল বাগান মালিকেরা জাতীয় এ ফল চাষ থেকে আশার আলো দেখছেন। কাঁঠালের উপযুক্ত বাজারমূল্য পাওয়ার আশাও করছেন তারা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলায় যে পরিমাণ কাঁঠাল উৎপন্ন হয় তার সিংহভাগ আসে শ্রীপুর উপজেলা থেকে। এই উপজেলায় জমি আছে কিন্তু কাঁঠাল গাছ নেই এমনটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। গাজীপুরে প্রতি বছর ৯ হাজার ১শ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় উৎপন্ন হয় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি। শ্রীপুরের উঁচু লাল মাটির কারণে এখানকার কাঁঠাল সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং মানসম্মত হয়।

বৈশাখ থেকে ভাদ্র বছর ঘুরে এই সময়টাতে গাজীপুরের গাছে গাছে শোভা পায় জাতীয় ফল কাঁঠাল। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও বিপণনের অভাবে প্রতি বছরই বাগানে পচে নষ্ট হয় টনকে টন জাতীয় এই ফল। আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠালের রসে তৈরি করছেন বিস্কুট, যা ফলের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই ধরে রাখছে। কোনো কৃত্রিম ফ্লেভার ছাড়াই তৈরি এই কাঁঠালের বিস্কুট বাজারে আসতেই অনলাইনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাহিদা। নতুন ধরনের এই বিস্কুট নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দারুন কৌতুহল।

কারখানায় কাঁঠাল বিস্কুট উৎপাদনে নিয়োজিত প্রধান কারিগর মানিক মিয়া বলেন, পাকা কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে ব্লেন্ডার করা হয়। পরে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো প্রকার ক্যামিকেল ছাড়াই মিক্সার মেশিনে দেওয়া কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ একসঙ্গে মিক্সার করা হয়। এসব উপকরণ মিক্সার হয়ে মন্ড তৈরি হয়ে গেলে টেবিলে উঠিয়ে ডাইস দিয়ে কেটে বিস্কুট তৈরির ট্রে’তে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। একটি ট্রেতে ৩৬ পিস বিস্কুট দেওয়া যায়। এরকমভাবে একটি ট্রলিতে ৩৬টি ট্রে একসঙ্গে রেখে তারপর ওভেনে দেওয়া হয়। পরে ২৫ মিনিট পর বিস্কুট ওভেন থেকে বের করা হয়। ঠান্ডা হলে ট্রে থেকে নামিয়ে বক্স করা শেষে বাজারজাত করা হয়। একটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দেওয়া থাকে।

স্টিড ফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী রাকিব বলেন, দুই মাস ধরে কাঁঠালের বিস্কুটের অনলাইনের অর্ডারগুলো মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলস্ এর ‘মেহমান ফুড’ থেকে নিয়ে যাচ্ছি। দিনে দিনে অর্ডার বাড়ছে। একবার যিনি অর্ডার দিচ্ছেন নতুন ভোক্তার পাশাপাশি পুরোনো ভোক্তা আবারও অর্ডার করছেন। কখনো কখনো দিনে একাধিকবার অর্ডার নিয়ে যেতে হচ্ছে। ভোক্তার কাছ থেকে বেশ সাড়া পাচ্ছে এই “কাঁঠালের বিস্কুট”।

কাঁঠালচাষী নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রীপুর তথা গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টাকার কাঁঠাল সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পচে গলে নষ্ট হয়। এগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাগানের ফল বাগানেই পচে গলে নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তা বাজারজাত করলে আমাদের মতো অনেক চাষি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া বলেন, আমি দেশের বাইরে বিশেষ করে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ভ্রমণ করেছি। সেসব দেশে দেখতে পেয়েছি কাঁঠাল দিয়ে কীভাবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদন করে তারা বাজারজাত করছে। তা থেকেই মূলত: আমি কাঁঠালের বিস্কুট তৈরির সিদ্ধান্ত নেই। ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ আরও খাদ্রপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার যদি নতুন এসব খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট ও টেক্স মওকুফ করে তাহলে ভোক্তার দোরগোড়ায় সুলভ মূল্যে তা পৌঁছানো সম্ভব।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল উৎপাদন হয় এবং প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল অপচয় হয়ে থাকে। কাঁঠালের অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ’ ইতোমধ্যেই প্রায় ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি এবং উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে এগুলো বিক্রিও করছেন।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এক উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া কাঁঠাল থেকে বিস্কুট তৈরি করেছেন, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল এবং পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে যে পাউডার তৈরি করা যায় এতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। বিশেষ করে প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার- আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। কাঁঠালের এই পাউডারগুলি যদি আমরা আটা বা ময়দার সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিক্সড করে পাঁপড়, বিভিন্ন কুকিজ যেমন: বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি, আইসক্রিম এবং পাকা কাঁঠালের পাল্প দিয়েও একইভাবে বিস্কুট ও কেকসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা যায়। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। এগুলো বিক্রির মাধ্যমে আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। আমাদের যারা উদ্যোক্তা তারা বিক্রি করে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন তেমনই পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কাঁঠালের যে অপচয়, সে অপচয় রোধেও সহায়তা করবে।